(মাসুদ রানা রাজশাহী)
রাজশাহীর কৃষিপ্রধান উপজেলা বাগমারায় উদ্বেগজনক হারে কৃষিজমির শ্রেণি পরিবর্তন করে পুকুর খনন এবং উর্বর টপসয়েল বিক্রির অভিযোগ উঠেছে।
একের পর এক তিন ফসলি জমি কেটে পুকুরে রূপান্তর ও মাটির বাণিজ্যের ফলে কৃষি উৎপাদন পরিবেশ গ্রামীণ যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং খাদ্য নিরাপত্তা মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়ছে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয় বাসিন্দা কৃষক ও সচেতন মহল।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায় উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে আবাদি জমির শ্রেণি পরিবর্তন করে অবাধে পুকুর খনন করা হচ্ছে। একই সঙ্গে উর্বর কৃষিজমির ওপরের স্তরের মাটি কেটে ইটভাটা ও বিভিন্ন স্থানে বিক্রি করা হচ্ছে।
অভিযোগ রয়েছে, একটি প্রভাবশালী চক্র প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে কিংবা প্রভাব খাটিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কোটি টাকার এই অবৈধ বাণিজ্য পরিচালনা করছে। কোথাও অর্থের প্রলোভন কোথাও ভয়ভীতি প্রদর্শন আবার কোথাও জমির মালিকের অজ্ঞাতেই মাটি কেটে নেওয়ার ঘটনাও ঘটছে।
অভিযোগ অনুযায়ী মাড়িয়া ইউনিয়নের নিমপাড়া মৌজা গোয়ালকান্দি ইউনিয়নের দুলালিপাড়া শুভডাঙ্গা ইউনিয়নের ধামিনকৌড় পশ্চিম বিল যুগীপাড়া ইউনিয়নের শান্তিপুর ও বারোইহাটি ঝিকড়া ইউনিয়নের বারুইপাড়া এবং রাজরামপুরসহ উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় অবৈধভাবে পুকুর খনন ও মাটি বিক্রির কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
সরেজমিনে দেখা যায় ট্রলি ও ভারী যানবাহনে মাটি পরিবহনের কারণে বহু গ্রামীণ সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সামান্য বৃষ্টিতেই এসব সড়কে সৃষ্টি হচ্ছে দুর্ভোগ। স্থানীয়দের অভিযোগ রাত নামলেই শুরু হয় মাটি কাটার মহোৎসব। গভীর রাত থেকে ভোর পর্যন্ত চলে খননকাজ আর দিনের বেলায় কার্যক্রম বন্ধ রেখে প্রশাসনের নজর এড়ানোর চেষ্টা করা হয়।
রাজরামপুর গ্রামের বাসিন্দা ও বীর মুক্তিযোদ্ধার সন্তান সাদ্দাম অভিযোগ করে বলেন সরকারি বন্দোবস্তপ্রাপ্ত কৃষিজমিও পুকুরে রূপান্তর করা হয়েছে। এ বিষয়ে প্রতিবাদ করায় তাকে বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি প্রদর্শন করা হয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি অবৈধ পুকুর খনন ও মাটি ব্যবসার কারণে দ্রুত কমে যাচ্ছে আবাদযোগ্য জমি। একই সঙ্গে নষ্ট হচ্ছে প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা ব্যাহত হচ্ছে পরিবেশের স্বাভাবিক ভারসাম্য। ভবিষ্যতে এর প্রভাব কৃষি উৎপাদন ও খাদ্য নিরাপত্তার ওপর মারাত্মকভাবে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী দুই বছর আগে বাগমারা উপজেলায় পুকুরের সংখ্যা ছিল ৪ হাজার ৮৮৫টি। বর্তমানে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬ হাজার ৬৭৪টিতে। অর্থাৎ মাত্র দুই বছরে নতুন করে ১ হাজার ৭৮৯টি পুকুর খনন হয়েছে। স্থানীয়দের দাবি প্রকৃত সংখ্যা সরকারি হিসাবের চেয়েও বেশি।
তবে অবৈধ পুকুর খনন রোধে উপজেলা প্রশাসন বিভিন্ন সময়ে গোয়ালকান্দি গণিপুর পারিলা বিল গেরদিগোপাল মাড়িয়া ভবানীগঞ্জ ঝিকড়া শুভডাঙ্গা যোগীপাড়া ও মচমইলসহ বিভিন্ন এলাকায় অভিযান পরিচালনা করেছে। এসব অভিযানে একাধিক এক্সকাভেটর মেশিন জব্দ ও অকেজো করা হয়েছে। পাশাপাশি নোটিশ প্রদান কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে কৃষিজমির শ্রেণি পরিবর্তন দেশের খাদ্য নিরাপত্তার জন্য দীর্ঘমেয়াদি হুমকি। ভূমি ব্যবহার নীতিমালা অনুযায়ী তিন ফসলি জমিতে পুকুর খনন নিরুৎসাহিত করা হলেও বাস্তবে আইন লঙ্ঘনের প্রবণতা বাড়ছে। এছাড়া অনুমোদন ছাড়া মাটি উত্তোলন বিদ্যমান আইন অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
এ বিষয়ে বাগমারা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সেলিম আহমেদ বলেন অবৈধ মাটি কাটা ও পুকুর খননের বিরুদ্ধে প্রশাসনের অভিযান নিয়মিতভাবে পরিচালিত হচ্ছে। গত মাসেই এ সংক্রান্ত ২৯টি মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয়েছে।
অভিযানে ব্যবহৃত প্রায় সব এক্সকাভেটর মেশিন অকেজো করা হয়েছে এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এ অভিযান ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে।
রাজশাহীর জেলা প্রশাসক কাজী শহিদুল ইসলাম বলেন কেউ যদি প্রশাসনের নাম ব্যবহার করে অবৈধ পুকুর খননের অনুমতির দাবি করে তাহলে বিষয়টি দ্রুত স্থানীয় প্রশাসনকে জানাতে হবে। কোনো অনিয়ম বা অবৈধ কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না।
এলাকাবাসী কৃষক ও সচেতন নাগরিকদের দাবি কৃষিজমি রক্ষায় অবিলম্বে আরও কঠোর ও কার্যকর অভিযান পরিচালনা করতে হবে। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক সংস্কার অবৈধ মাটি বাণিজ্য বন্ধ এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় কৃষিপ্রধান বাগমারার উর্বর ভূমি ও কৃষি ঐতিহ্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।
Leave a Reply